একজন সফল উদ্যোক্তার গল্প সবসময়ই অনুপ্রেরণার উৎস। ফায়জা আহমেদ ছিলেন একটি অভিজাত অন্দরসজ্জা প্রতিষ্ঠানের মালিক। আয় ছিল বেশ ভালো, তবুও মনকে যেন তৃপ্ত করতে পারছিলেন না। কারণ, দেশীয় ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে কাজ করতে চাইলেও বেশিরভাগ ক্লায়েন্ট বিদেশি নকশা পছন্দ করতেন। এভাবে নিজের সৃজনশীলতা দমিয়ে রাখতে আর রাজি ছিলেন না তিনি।
২০১৩ সালের ৩১ অক্টোবর, নিজের জন্মদিনেই ফায়জা সিদ্ধান্ত নিলেন নতুন পথ বেছে নেবেন। চারুকলায় পড়াশোনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ফ্যাশন ডিজাইনে যুক্ত হলেন। হাতে থাকা অল্প পুঁজি দিয়ে ১৬টি সাধারণ তাঁতের শাড়ি কিনলেন এবং তাতে বাংলা ভাষার খ্যাতিমান সাহিত্যিকদের কবিতা ও গান যোগ করে রূপ দিলেন অনন্য শিল্পকর্মে। তাঁর সৃজনশীল ভাবনা দ্রুতই জনপ্রিয়তা পায় এবং বিক্রিও হয়ে যায়। তখনই প্রতিষ্ঠা করেন নিজস্ব ব্র্যান্ড “মানাস”, যা আজ দেশের ফ্যাশন জগতে পরিচিত এক নাম।
মানাসের যাত্রা সহজ ছিল না। শুরু থেকেই তাঁকে শুনতে হয়েছে, তাঁর পোশাকের দাম বেশি! কিন্তু ফায়জা কখনো আপস করেননি। তিনি বলেন, “আমি শুধু পোশাক বিক্রি করি না, আমি গল্প বিক্রি করি। আমার ডিজাইনের প্রতিটি টুকরায় থাকে বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।” তিনি মাইকেল মধুসূদন দত্ত, লালন ফকির, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায়, জয়নুল আবেদিনসহ বহু গুণীজনের সৃষ্টিকে পোশাকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন। এমনকি ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর টিকিটের নকশাও মানাসের পোশাকে উঠে এসেছে।
একসময় তিনি শুধু ফ্যাশনে সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন “সঞ্চয়িতা” নামের একটি রেস্তোরাঁ। এটি প্রথমে বিভিন্ন ধরনের খাবার পরিবেশন করলেও পরে পুরোপুরি নিরামিষভিত্তিক (ভেগান) হয়ে যায়। কারণ, তাঁর ছেলে সুনীয়েলের সংবেদনশীলতার কারণে তিনি বুঝতে পারেন, খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়াতেও মানবিকতা থাকা উচিত।
আজ ফায়জা আহমেদ মানাস ও সঞ্চয়িতাকে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছেন। ফ্যাশন ডিজাইন কাউন্সিল অব বাংলাদেশসহ বিভিন্ন নারী উদ্যোক্তা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তিনি। শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সফলতা নয়, এই নতুন যাত্রা তাঁকে দিয়েছে মানসিক তৃপ্তি এবং আত্মতৃপ্তির এক নতুন দিগন্ত।